Saturday, September 16, 2017

খুনসুটি

সারাদিন খাটা খাটুনির পর অফিস থেকে ফিরে একটু হাত পা ছড়িয়ে ফ্যান এর তলায় বসলো অসিত। লাস্ট দু সপ্তাহ খুব হেক্টিক গেছে। প্রমোশন তারপর বদলি, নতুন শহর, আবার একটা ঠিক ঠাক বাড়ী ভাড়ার জন্য খোঁজা, এক ঘর জিনিস পত্র সরানো, খুব ধকল যাচ্ছে। এইসব ভাবতে ভাবতে রেগুলেটর টা একটু বাড়াতে গেল অসিত, আর ব্যাস, লোডশেডিং।
---ধুর শালা, কপাল টাই খারাপ।
--" তাই হবে, তুমি আজও ইনভার্টার এর কানেকশন টা ঠিক করলে না, "...টর্চ নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে উঠলো শ্রাবণী।
-- সারাদিন কাজের পর আর কিচকিচ করো না তো, আমারো তো একটা সীমা আছে নাকি, কতোদিক কত তাড়াতাড়ি সামলাবো ??
-- তুমি একাই সব সামলাও ?? সারাদিন ধরে আমি ঘরে থাকি বলে কি কিছুই করিনা বলতে চাও?একটা ছুটির দিন শুধু তোমার ছেলেটা কে ,এক বেলা সামলে দেখাও , বাকি ঘরের কাজ বাদ ই দিলাম ,তারপর মেজাজ দেখাবে।
দুঃস্বপ্নেও জেতা যাবে না, এরকম যুদ্ধে না নামাই ভালো। ডিসকভারি তে মাঝে মাঝেই দেখায় স্বয়ং বিশালাকায় সিংহ মামাও সিংহী র দাবড়ানি এর সামনে ল্যাজ গুটিয়ে বসে পড়ে, তো অসিত কোন ছারপোকা !!!
পাশের রুমে ছোটা শাকিল ততক্ষনে দুষ্টুমি ভুলে অন্ধকারে চিল চিৎকার জুড়েছে। প্রায়োরিটি সেট করা হয়ে গেল। শাউটিং কিড না ক্ষুব্ধ বউ । প্রথম টাই শান্ত করা জরুরি। চুপচাপ বাচ্চা কে কোলে করে ছোট্ট ব্যালকনিতে চলে যায় অসিত। আর দিন দুয়েক বাদেই পূর্ণিমা।অনেক টা চাঁদের আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। বউ চুপচাপ ব্যালকনির আরেক কোনে দাঁড়িয়ে। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অসিত হঠাৎ বলে উঠলো,
--- আমার চশমা কোন ক্লাসে লেগেছিল জানো??
-- না, তাতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে?
-- তাও ঠিক। আচ্ছা, বাদ দাও।
‌খুব ই পুরোনো ট্রিক।কিন্তু দরকারে খুব কাজে দেয়।কিউরিওসিটির সলতে পাকিয়ে ছেড়ে  দাও।
--কি হলো, বলবে??
--- কি বলবো?
-- ন্যাকামো তুমিও কম করো না। তোমার চশমার গল্প।
-- ওহ, ওই টা কিছুনা।
-- তুমি বলবে,  হ্যাঁ কি না ?
--বলছি বলছি, আমার চশমা লেগেছিল ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে ওঠার সময়।লোডশেডিং এর জন্য।
-- মানে?
-- মানে আর কি? তখন তো আর ব্যাটারী, ইনভার্টার ছিল না, মানে আমার বাবা তখন ও এনে দিতে পারে নি। তো হারিকেন ই ভরসা।
-- তার সঙ্গে চশমার কি ??
-- কিছুই না, হোম টাস্ক ক্যান ওয়েট, চাচা চৌধুরী, বিল্লু, পিঙ্কি, সাবু , রাকা কান্ট। যত খুদে খুদে লেখাই হোক, যত কম আলোই হোক, পড়ে ফেলতেই হবে। আমাদের বাবু বোধহয় এই সব আর পড়বে না বলো,   বড়ো হয়ে??
-- কে জানে!!মোবাইল, কিন্ডল, ট্যাব কত কি এসেগেছে,বই হাতে নিয়ে পড়ার কি দরকার!! আমার চাঁদমামার একটা বিশাল কালেকশন ছিল জানো, পুজোতে বাপের বাড়ি গেলে পুরোনো আলমারি গুলো ঝেড়ে দেখতে হবে।
-- বা বা, তুমি এতদিন বলোনি তো?
--তুমিও কি বলেছিলে যে কমিকস পড়ে পড়ে তোমার চোখে চশমা লেগেছিল??
-- শোধবোধ, ওকে? তুমি হারিকেন এর কাচ পরিস্কার করে কেরোসিন ভরে ঠিক ঠাক জ্বালাতে পারবে? আমি পারতাম । কেরোসিনের একটা অদ্ভুত দারুন গন্ধ হয় , যেটা ছোট বেলায় কেন জানিনা খুব ভালো লাগতো। আমি মেঝেতে বসে হারিকেন ঠিক ঠাক ফিটিং করতাম, আর আর ঠাম্মা পান চিবোতে চিবোতে মাঝে মাঝে সেই সময় ই ভূতের গল্প বলতো। আজকাল আর কেউ গল্প বলে না বলো, সবাই গল্প ফরওয়ার্ড করে।
-- তাই হবে, এই সব বাজে কথা ছেড়ে উঠবে, বাচ্চা টা ঘুমিয়ে গেল যে!!
-- হ্যাঁ, এনাকে ন্যাপি পরিয়ে যথাস্থানে সেট করে দিতে হবে  দেখছি, একটু ধরো দেখি। এই দেখ,
 কারেন্ট ও এসেগেল। যাক বাবা , শান্তি ।
-- হ্যাঁ, তোমার ওই সব ভাট বকা থেকেও শান্তি দাও। তাড়াতাড়ি ডিনার টা সেরে আমাকে উদ্ধার করো।
-- তুমি না খুব আনরোমান্টিক, বুঝলে?
-- তুমিও না খুব  প্যাথেটিক  , কাল যেন ইনভার্টার টা লোক এসে সারিয়ে দিয়ে যায়, বুঝলে??



Monday, August 28, 2017

অথ শস্য কথা


‌"এমন বসন্ত দিনে, বাড়ী ফেরো মাংস কিনে, বারোয়ারি ডাস্টবিনে জমে ওঠে ....." গুনগুন করতে করতে বিভুবাবুর মনে হল ,ধুর শালা ,এটা তো অগাস্ট মাস, বসন্ত কোত্থেকে আসবে??বহুদিন বাদে একটা ক্যাজুয়াল লিভ মেরেছেন বিভুবাবু, এই বছরে এই প্রথম, গিন্নি খুশ, দারুন গন্ধ ভেসে আসছে রান্না ঘর থেকে। বিভুবাবু মহা অলস লোক, ছুটি নিয়ে সারাদিন বাড়িতেই থাকবেন, সারাদিনে কিছু না খেতে দিলেও পরোয়া নেই, ল্যাদ খেয়ে কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু, ভাগ্য এতটাও প্রসন্ন নয়, গিন্নির হুকুম, বসে বসে তো মোটা হচ্ছ, আনন্দবাজার চেবানো শেষ হলে যাও না একটু মাছ বাজারে, বৃষ্টি হচ্ছে, ভাবছি খিচুড়ি করবো, সঙ্গে তো কিছু লাগবে নাকি??

অগত্যা পাশের ফ্লাট এর অভি বাবু কে নিয়ে চললেন কোতোয়ালি বাজারে, অলস লোকেরা সাধারণত বুদ্ধিমান হয়, কাছের বাজার টা  অন্তত চিনে রাখতেই হয়।বাজারের শুরু থেকেই প্রত্যেক মাছ ওলার একটাই চিৎকার, "দাদা পাঁচশোর মাল চারশয়, শুধু আপনার জন্য সাড়ে তিনশোয়, আপনি তো রেগুলার নেন দাদা, আপনাকে আর কি বলবো!!" বিভূবাবু তিন মাস বাদে এই বাজারে এলেন।যাই  হোক, আরো এগিয়ে চললেন ।
অভি বাবু পোড়খাওয়া বিষয়ী মানুষ, প্রায় কাকার বয়সি, তার সাবধানবাণী ,"নিজে টিপে দেখে পরখ   না করে কিছু নেবে না, বৌমা বলেই দিয়েছে যে তোমার মতো ন্যলা কেবলা লোক বিরল, একটু দেখে কিনবে,"।  রাগে গা হাত পা জ্বলে গেলেও উপায় নেই। অভিবাবু এক জন প্রকৃতই শুভানুধ্যায়ী। সাত পাঁচ আর না ভেবে ইলিশ সমুদ্রে ডুব দিলেন বিভু বাবু। সরু ইলিশ, মোটা ইলিশ, রোগা ইলিশ ,চওড়া ইলিশ,বুড়ো ইলিশ, খোকা ইলিশ, দীঘার ইলিশ, কোলাঘাটের ইলিশ, পালিশ করা ইলিশ আবার বালিশের মতো ইলিশ। বিভু বাবুর চোখ বড়বড় হয়ে যাচ্ছে এটা ভেবে যে এই সবের ই সদগতি হবে, ঝোলে হবে, ঝালে হবে , অম্বলে বা টকে হবে , আরো চাইলে ভাপে হবে , দিবে শুধু  দিবে, মিলাবে মিলিবে , যাবে না কেহই ফিরে।

গোটা বাজার ঘোরা হয়ে গেল।এবার কিনতেই হবে, কানকোর ঠিক তলায় একটু টিপে দেখে নিলেন, নাহ, বেশ শক্ত পোক্তই মনে হচ্ছে, দাও ভাই এটাই কেটে দাও। ঠিক ঠাক পিস কোরো ভাই, নয়তো আমার  পিস নষ্ট হয়ে যাবে। অভি বাবু একটু বিজ্ঞের হাসি দিলেন,আর মনে মনে বললেন"আজকালকার ছোকরা, গুছিয়ে বাজার করার যে আনন্দ কতটা , কি আর বুঝবে!" ফিচকে মাছ ওলা ও কম যায় না, কাটতে কাটতেই বলে উঠলো," এমন মাছ দিচ্ছিনা দাদা, দেখবেন বৌদি নিজেই মাছ ছাড়িয়ে আপনাকে খাইয়ে দেবেন"। আর বিভুবাবুর ও মনে পড়ে গেল ঠিক বিয়ের আগের বছর এর কথা,দুই বাড়িতেই সব জানাজানি হয়েগেছে, খালি ডেট ফাইনাল করা বাকি,এমন সময় একদিন ডিনার এ নেমন্তন্ন হবু শ্বশুর বাড়িতে। খাসী মাংসের সাথে ইলিশের ঝাল ও আছে। ইলিশ পছন্দের মাছ হলেও কাঁটা টা ঠিক ম্যানেজ করতে পারেন না বিভু বাবু, তাই ইলিশ ভাজা ই বেশি পছন্দ। পড়ে গেলেন মহা  বেকায়দায়। হবু শালী দের সামনে, বউ এর মাসী দের সামনে চূড়ান্ত কেস খাওয়া। অবশেষে উদ্ধারে সেই অর্ধাঙ্গিনী  । প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিভুবাবু যে পরের জামাই ষষ্ঠী তে দেখিয়ে দেবেন যে তিনি কত এক্সপার্ট কাঁটা ছাড়াতে , দরকার হলে কাঁটা চামচ দিয়েও কাঁটা ছাড়ানো শিখে নেবেন।

সাত বছরের পুরোনো ছেলেমানুষির কথা ভেবে নিজেই একটু হেসে নেন । ইলিশ ততক্ষণে মাছের ব্যাগ এ ঢুকে পড়েছে। তারপর পকেট হালকা আর মন আনন্দে পূর্ণ করে , অভি বাবুর দিকে তাকিয়ে  বিভু বলেন,"চলুন দাদা ,এবার বাড়ি ফেরা যাক"  ....

Saturday, July 8, 2017

ক্যারম

~~"আমি ডান দিকের সিঁড়িটা দিয়ে উঠে যাচ্ছি অনীশ, তুই আমাকে কভার কর,"হিস হিসিয়ে কথাটা বলেই নিঃশব্দে উঠেগেল রোহিত।জার্মান মাউজার এর লক টা আরেকবার দেখেনিল অনীশ।এরকম কভার্ট অপারেশন নতুন নয়,আট বছর হয়েগেলো ফোর্স এ ,তবুও বেসিকস ঠিক  রাখতেই হয়। পাক্কা ইনফরমেশন আছে, কিছু এক্সট্রিমিস্ট এই বিল্ডিং এরই পাঁচ তলায় আছে।আরেক টা ফ্লোর উঠে ডান দিকে ঘুরতেই কপালে জোর একটা আঘাত, তারপর ই সব ব্ল্যাক আউট।

জ্ঞান ফিরতে দেখলো, ওপর থেকে ঝুলিয়ে রাখা আছে তাকে।লোহার রড লাল  করে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে অনীশ এর দিকে, দাতে দাঁত চেপে অনীশ অপেক্ষা করতে থাকলো টর্চারের। মরে যাবে তবু মুখ খুলবে না,এ ট্রেনিং নেওয়া আছে,আজ পরীক্ষার দিন।রোহিত  টা যে কোথায় গেল!!!আবার যখন জ্ঞান ফিরলো,আর্মি হসপিটাল এ শুয়ে আছে অনীশ।খালি কোমরের তলায় সাড় নেই।ডাক্তার বলেগেলেন ,"সরি ফর ইওর লস মাই ব্রেভ সন, ইউ ডিড এ গ্রেট সার্ভিস টু ইওর কান্ট্রি,ইওর ফোর্স"!!! ম্লান হাসি খেলে গেল অনীশ এর মুখে।ওই তো একটা খালি হুইল চেয়ার নিয়ে ঢুকছে রোহিত আর   রিয়া। হৃদপিন্ড টা যেন এক সেকেন্ড এর জন্য থমকে গেল ,তবে কি যা শুনেছিল সবই সত্যি !!! ব্যথার ভান করে চোখ বুজল অনীশ।আর কারুর কোনো কথাই শুনতে ইচ্ছে করছে না।

এক বছর কেটে গেছে।রোহিত এর প্রতিপত্তি, লিডারশিপ এবিলিটি তে সবাই মুগ্ধ।সবচেয়ে বড় কথা , ডিরেক্ট কমব্যাট থেকে ট্রান্সফার হয়ে টেক ডিপার্টমেন্ট এর হেড অনীশ অব্দি তার সাপর্টে, রোহিতের চিফ অফ ডিপার্টমেন্ট হওয়া আটকায় কে? টেক ডিপার্টমেন্ট এর ছোট্ট ঘরটাই অনীশ এর সব।অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াও রয়েছে একটা বিরাট ম্যাচ বোর্ড, ক্যারম এর। ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ছিল অনীশ।এখনো ক্যারম এর স্ট্রাইকার তার নিঃসঙ্গতাকে ভরসা দেয়।শুধু রোহিত কে সে টাচ করতে দেয় ওই বোর্ড টা। আজ একটা অপারেশন এর পর ফিরলো রোহিত,শুট এট সাইট এনকাউন্টার অর্ডার ছিল। একটা গুলি ডান হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে।ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়লো, অনীশ এর চেম্বার এ।জামাখুলে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে বসলো।অনীশ চুপ চাপ গুটি সাজাচ্ছিলো বোর্ডে।দেখলো নতুন ট্যাটু করিয়েছেন রোহিত বাবু,ডান কোমরের কাছ থেকে পেট অব্দি সিংহের মুখ।সিক্স প্যাক চেহারায় ভালোই খুলেছে ব্যাপার টা।ম্যাচ শুরু হতেই মুচকি হেসে অনীশ বলল,"একটা পুরোনো সমস্যা সলভ হয়েছে।জেনে গেছি আমাকে সেই টর্চারের পেছনে কে ছিল। মুড ভালো আছে, তোকে আজ সেঞ্চুরি বোর্ড মারবো।বলেই স্ট্রাইক।হিটে ই চার গুটি গেল। লাস্ট গুটি টা ফেলার সময় দেখলো ঠিক অপজিট এঙ্গেলে বোর্ডের ডায়াগোনালি দাঁড়িয়ে রোহিত, মুখ হাঁ করে দেখছে জিনিয়াস অন হুইলস এর খেলা।অনীশ বলল,রোহিত ঐখানেই দাড়া, তোকে চটকা শট দেখাই।বলেই ডান হাতের মধ্যমা আর বুড়ো আঙ্গুল এরমাঝে স্ট্রাইকার বসিয়ে অদ্ভুত ভাবে একটা হিট করলো নিজের বেসে এ।স্ট্রাইকার কোনাকুনি ছিটকে গিয়ে রোহিতের সামনের পকেটে গিয়ে ফেলেদিল শেষগুটি।এক মুহূর্তের জন্য যেন চিনচিনে ব্যাথা পেলো রোহিত, পর মুহূর্তেই সব ঠিক।আস্তে আস্তে খালি বোর্ডের উপরে একটা কার্ড রাখে রোহিত।তার আর রিয়া এর বিয়ে।প্রথম ইনভাইট অনীশ কে।পুরোনো স্মৃতি যেন চলকে ওঠে চোখের সামনে।বেস্ট উইশ জানিয়ে অল্প হাসে অনীশ।পরের দিন সকালেই খবর আসে অফিস এ। নিজের বাথরুমের ভেতর রোহিতের ডেড বডি পাওয়া গেছে। পোস্টমর্টেম এ জানা যায় বিষক্রিয়ায় মৃত্য।তার মোবাইল ট্র্যাক করে দেখাগেল এনকাউন্টার এর পরে  অনেকগুলো বার এ সেই রাতে রোহিত ঢুকেছিলো অফিস ফেরার আগে।নেশা হিসেবে মাঝে মধ্যে ইনজেকশন নিতো রোহিত, বাঁ হাতে ইনজেকশন এর দাগ ও ছিল।গোটা শরীর  জুড়ে ট্যাটু।সেটাই কি কাল হলো??

আরও ছয়মাস কেটে গেল।নতুন চিফ অফ ডিপার্টমেন্ট এর ট্রান্সফার এর জন্য ফেয়ার ওয়েল নিচ্ছে অনীশ।মুম্বাই চলে যাচ্ছে সে।হুইলচেয়ার তার কাজের ক্ষেত্রে উন্নতিতে বাধা হতে পারেনি। সবাই কে ধন্যবাদ জানিয়ে সে বললো যে সে চলে যাওয়ার পর যেন তার বন্ধুর স্মৃতিতে ওই ক্যারম বোর্ডে আর কেউ না খেলে।পাতলা প্লাষ্টিক কভার একটা চাপিয়ে চলে যায় সে।

নতুন বাচ্চা সুমিত  জয়েন করেছে। সে নাকি দারুন ক্যারম খেলে।সবাইতাকে পুরনো গল্প শোনায়। থাকতে না পেরে একদিন   সেই বোর্ডের কভার খুলে সে  আনমনে  হাত বুলোতে থাকে।এত সুন্দর পালিশ করা ম্যাচ বোর্ড।আর কেউ খেলে না এটায়! কি দুর্ভাগ্য! হটাৎ ই একটা পকেটের পাশে হাত দিতেই মনে হয় কেউ যেন  একটা চিমটি কাটলো । সুইচ টা দেখতে পায়নি সুমিত ,যেখানে বলে বলে হিট করতো অনীশ এর স্ট্রাইকার, বিষ মাখানো নিডল টা চোখের পলকে বোর্ড এর সেই পকেটের বাইরের দিক থেকে বেরিয়ে সুমিতের ডান কোমরে ছুঁয়ে আবার ভেতরে ঢুকে যায় ~~~~~



Sunday, June 25, 2017

প্রসাদের থালা

আমি বল্টে, বয়স চোদ্দ, রোগাটে গড়ন, গায়ের রং কালো, আর বয়সের তুলনায় একটু লম্বা আর একটু পাকা, বরেন কাকু বলে। রঘুনাথপুরের স্টেশনের ঠিক পেছনে বুড়ো বট তলার পূর্ব পাশেই বরেন  কাকুর দো তলা মাটির বাড়ি। জন্ম থেকে সেখানেই আছি। বরেন কাকুর তিনকুলে কেউ এখন আর নেই, আমারও  কেউ ছিল কিনা জানি  না। বছর কুড়ি আগেই একটা এক্সিডেন্ট এ বরেন কাকুর বউ,বাচ্চা,বাবা আর মা মারা যান। বরাতজোরে টিকে গেছিলো বরেন কাকু।আর বিয়ে করেনি।বাড়িটাকে একটা অনাথ আশ্রম বানিয়ে দিয়েছে।আমি ই এক নম্বর এই বাড়িতে।আরো আটজন আছে। বরেন কাকু আমাকে স্টেশনের ধারে রাখা একটা  ভাঙা ওয়াগোনের ভেতরে পেয়েছিল গামছা জড়ানো অবস্থায়।চারপাশে অনেক জং ধরা নাট বল্টু পড়ে ছিল।সেই থেকে  আমি বল্টে ।
এক নম্বর তাই একটু বেশি ভালোবাসে।কি যেন বলল,হ্যাঁ, আমাকে দত্তক নিয়েছে, নাম দিয়েছে অজয়, আমার আধার কার্ড ও আছে। ক্লাস এইটে পড়ি আমি।পরশুদিন ক্লাসে ব্যাটারী নিয়ে এসেছিলেন ভৌতবিজ্ঞানের স্যার। বেশ মজার জিনিস শেখালেন।কাল স্কুল ছুটি, কাল তো রথ।এই রথের দিনগুলো বেশ মজা হয়, বরেন কাকু রথ এনে দেয় একটা ছোট্ট, আমরা সবাই মিলে সেটাকে সাজাই। রথ সাজানো কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়।রঙ্গিন কাগজ,সেলোটেপ, আঠা,কাঁচি আরো কত কি লাগে।
আমাদের পাড়ায় প্রতি বছর রথের মেলা হয়, রথ কম্পিটিশান হয়, একবার ও ফার্স্ট হতে পারিনি।এবারে ও চেষ্টা করতে হবে।শোলা কেটে নকশা ভালোই পারি, কিন্তু আলো নিয়েই মুশকিল,মোমবাতি ই ভরসা। কিন্তু এবারে ঠিক করেছি ব্যাটারী  আলো করবো।এভারেডি ব্যাটারী এনেছি বড় গুলো,তিন টে।একটার পর একটা পরপর লাগিয়ে ভালোকরে খবরের কাগজে এগ রোলের মতো পাকিয়ে নিয়েছি।এবার টুনি কিনে হোল্ডারে জুড়ে দিলেই হলো।লাল তার একদিকে আর অন্য দিকে কালো তার , আর পুরোটাকে আটকে রাখার জন্য গার্ডার। ব্যাস ,হয়েগেলো আলো।এইবারে প্রসাদ টাও ভালো করে করতে হবে, চানা, বাতাসা, কলা,শসা তো থাকবেই,ভাবছি নকুলদানাও দেবো।অনেক কষ্টে বরেন কাকুকে রাজি করিয়েছি।আসলে ধান্দা অন্য।আমি দেখেছি যে রথের মেলায় লোকে চারাগাছ ছাড়া আর কিছু কেনে না,ভালো রথের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করে বটে কিন্তু প্রণামী দেয় না, কিন্তু প্রসাদ পেলে কিছু না কিছু দেবেই। সেই টাকা জমিয়ে পরের দিন ফিস্ট করব।সেটাই মজা। সব্বাইকে আমার প্ল্যান বলে দিয়েছি।সবাই রাজি। বরেন কাকু কে বলিনি,খুব মারবে তাহলে।
টাকা ভালোই উঠছে, জগন্নাথ,বলরাম,সুভদ্রার কৃপায়।এমন সময় হঠাৎ ভীষণ ঝড় উঠলো,তারসাথে বৃষ্টি। সব যেন লণ্ডভণ্ড করেদেবে।সবাই পালাতে ব্যস্ত। একটাই মাত্র লোক তখন আমাদের রথের সামনে দাঁড়িয়ে,গম্ভীর মুখে আমাদের নাম কি,কোথায় থাকি জিগ্যেস করছে আর টকা টক প্রসাদ খেয়ে যাচ্ছে,প্রণামী দেওয়ার নাম ই নেই।আমরা তখন পালাতে পারলে বাঁচি।দুহাতে রথ টা জড়িয়ে দৌড় দিলাম আমি ।বাকিদের কেউ সামলাচ্ছে প্রণামী এর বাটি, কেউ প্রসাদের থালা। প্রচন্ড বৃষ্টি আর কড়কড় করে বাজ পড়ছে। সবাই আলাদা হয়েগেছি। রাত অনেক,ভয় ও করছে।অনেক দেরিতে যখন বাড়ি পৌঁছলাম,দেখি বরেন কাকু হ্যারিকেন হাতে বাইরের ঘরে পায়চারি করছে।আমাকে দেখে ,কান টা খুব জোরে পাকিয়ে দিয়ে বললো,"পালের গোদা হয়েছ? এক চড়ে পিঠ ফাটিয়ে দেব তোর, এতগুলো বাচ্চা কে নিয়েগেছিস,কোনো আক্কেল আছে?" কোনোমতে চোখের জল সামলে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লাম।প্রসাদের থালা, প্রণামী এর বাটি,সব হারিয়ে গেছে,রথ টা  এক কোণে রেখে প্রনাম করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে রোদ উঠেছে,আমাদের মন ও আকাশের মতো ঝকঝকে হয়ে উঠেছে।পান্তা,আলুমাখা আর কাঁচালঙ্কা খেতে খেতে বললাম,"জানো বরেন কাকু,আমাদের ফিস্ট ও গেলো, প্রণামী এর বাটিও গেলো, প্রসাদের থালা ও হারালো।তার ওপর একটা লোক কালকে প্রচুর কথা জিগ্যেস করলো,আমার নাম,তোমার নাম,ঠিকানা ,আরো কত কি ,প্রসাদ ও খেলো কিন্তু কি ছোটলোক ভাবো, প্রণামী দিলো না!!!"
বরেন কাকু আস্তে করে উঠে গিয়ে একটা সাদা খাম এনে সবার সামনে ফেলে বললো,
"তোরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে এসে প্রণামী দিয়েগেছেরে, এক হাজার এক টাকা,তোদের প্রথম পুরস্কার।"




Friday, June 23, 2017

অবচেতন কে চিঠি

অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম,তোমাকে একটা চিঠি লিখি, ইমেইল নয়, টেক্সট নয়,হোয়াটস আপ নয়, বিশুদ্ধ নিখাদ চিঠি।গোদা বাংলায়  ।ছোট্ট করে, অল্প কথায় । কিন্তু কি লিখবো ভাবছিলাম।কতকিছুই যে মাথায় আসে।সবচেয়ে বেশি আসে কিছু না লেখার অজুহাত।মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি আমার মতোই ক্লান্ত, এবং মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ বিরক্ত! কে জানে! তোমাকে জানার বা বোঝার বিশেষ চেষ্টা কোনোদিন করিনি।কি দরকার ,জীবনে করার মতো আরো কত কি আছে, কেন তোমাকে জেনে সময় নষ্ট করবো? যে ফর্মুলা ওয়ান এ আমি চলেছি,তাতে প্রতিটা পিট স্টপে শুধু এটাই ভাবতে  শেখানো  হয় যে আর কটা ল্যাপ বাকি। বরং মাঝে মাঝে চিন্তা করে দেখেছি যে তোমাকে জানার চেষ্টা করলে বিপদ বেশি।যেমন, তুমি আয়না হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে  বলবে যে আমি কেন জীবনে একটার সঙ্গে আরেকটা ভূমিকায় মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে পাল্টে নিচ্ছিনা ??? আমি বলবো,ধুত্তোর ,নিকুচি করেছে রোল প্লে এর নাটকের , আমি অফিসেও মাঝে মাঝে বাড়ির মতো,বাড়িতেও মাঝে মাঝে অফিসের মতো থাকবো, ভাববো ,হয়তো বা রিএক্ট ও করবো। ব্যালান্স করা জিমন্যাস্ট এর কাজ, আমার নয়। তুমি চুপচাপ শুনবে আর নিঃশব্দে হাসবে।আমি নিজেরই বকবকানিতে নিজে  ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ব, তুমি তো সদা জাগ্রত,ঘুমের বালাই নেই। তুমি অপেক্ষা করবে, আবার আমার জেগে ওঠার,দিন শুরু করার, কিছু ভুল শুরু করার।তুমি এক অদ্ভুত শিক্ষক, যে জ্ঞান দেয় না, সময় কে দিয়ে সময় মতো একটা থাপ্পড় কষিয়ে বুঝিয়ে দাও যে এখনো সময় আছে,শুধরে যা। সব সময় যে তোমার কথা শুনি এমন দাবি কোনোদিন করি না ,তবে চেষ্টা করি।আজ আর লিখবো না, অন্য আরেকদিন ।তোমার কথা আমার ঠিক মনে থাকবে।ও হ্যাঁ, কৈফিয়ত দেওয়ার কিছুই নেই ,তবুও বলি হঠাৎ কেন চিঠি লিখতে বসলাম,
 কারণ বহুদিন পর আবার মনে পড়ে গেল সেই অসাধারণ কথা টা," Talk to yourself at least once a day,otherwise you will miss talking to an excellent person".....ভালো থেকো,নিজের মতো।