Monday, August 28, 2017

অথ শস্য কথা


‌"এমন বসন্ত দিনে, বাড়ী ফেরো মাংস কিনে, বারোয়ারি ডাস্টবিনে জমে ওঠে ....." গুনগুন করতে করতে বিভুবাবুর মনে হল ,ধুর শালা ,এটা তো অগাস্ট মাস, বসন্ত কোত্থেকে আসবে??বহুদিন বাদে একটা ক্যাজুয়াল লিভ মেরেছেন বিভুবাবু, এই বছরে এই প্রথম, গিন্নি খুশ, দারুন গন্ধ ভেসে আসছে রান্না ঘর থেকে। বিভুবাবু মহা অলস লোক, ছুটি নিয়ে সারাদিন বাড়িতেই থাকবেন, সারাদিনে কিছু না খেতে দিলেও পরোয়া নেই, ল্যাদ খেয়ে কাটিয়ে দেবেন। কিন্তু, ভাগ্য এতটাও প্রসন্ন নয়, গিন্নির হুকুম, বসে বসে তো মোটা হচ্ছ, আনন্দবাজার চেবানো শেষ হলে যাও না একটু মাছ বাজারে, বৃষ্টি হচ্ছে, ভাবছি খিচুড়ি করবো, সঙ্গে তো কিছু লাগবে নাকি??

অগত্যা পাশের ফ্লাট এর অভি বাবু কে নিয়ে চললেন কোতোয়ালি বাজারে, অলস লোকেরা সাধারণত বুদ্ধিমান হয়, কাছের বাজার টা  অন্তত চিনে রাখতেই হয়।বাজারের শুরু থেকেই প্রত্যেক মাছ ওলার একটাই চিৎকার, "দাদা পাঁচশোর মাল চারশয়, শুধু আপনার জন্য সাড়ে তিনশোয়, আপনি তো রেগুলার নেন দাদা, আপনাকে আর কি বলবো!!" বিভূবাবু তিন মাস বাদে এই বাজারে এলেন।যাই  হোক, আরো এগিয়ে চললেন ।
অভি বাবু পোড়খাওয়া বিষয়ী মানুষ, প্রায় কাকার বয়সি, তার সাবধানবাণী ,"নিজে টিপে দেখে পরখ   না করে কিছু নেবে না, বৌমা বলেই দিয়েছে যে তোমার মতো ন্যলা কেবলা লোক বিরল, একটু দেখে কিনবে,"।  রাগে গা হাত পা জ্বলে গেলেও উপায় নেই। অভিবাবু এক জন প্রকৃতই শুভানুধ্যায়ী। সাত পাঁচ আর না ভেবে ইলিশ সমুদ্রে ডুব দিলেন বিভু বাবু। সরু ইলিশ, মোটা ইলিশ, রোগা ইলিশ ,চওড়া ইলিশ,বুড়ো ইলিশ, খোকা ইলিশ, দীঘার ইলিশ, কোলাঘাটের ইলিশ, পালিশ করা ইলিশ আবার বালিশের মতো ইলিশ। বিভু বাবুর চোখ বড়বড় হয়ে যাচ্ছে এটা ভেবে যে এই সবের ই সদগতি হবে, ঝোলে হবে, ঝালে হবে , অম্বলে বা টকে হবে , আরো চাইলে ভাপে হবে , দিবে শুধু  দিবে, মিলাবে মিলিবে , যাবে না কেহই ফিরে।

গোটা বাজার ঘোরা হয়ে গেল।এবার কিনতেই হবে, কানকোর ঠিক তলায় একটু টিপে দেখে নিলেন, নাহ, বেশ শক্ত পোক্তই মনে হচ্ছে, দাও ভাই এটাই কেটে দাও। ঠিক ঠাক পিস কোরো ভাই, নয়তো আমার  পিস নষ্ট হয়ে যাবে। অভি বাবু একটু বিজ্ঞের হাসি দিলেন,আর মনে মনে বললেন"আজকালকার ছোকরা, গুছিয়ে বাজার করার যে আনন্দ কতটা , কি আর বুঝবে!" ফিচকে মাছ ওলা ও কম যায় না, কাটতে কাটতেই বলে উঠলো," এমন মাছ দিচ্ছিনা দাদা, দেখবেন বৌদি নিজেই মাছ ছাড়িয়ে আপনাকে খাইয়ে দেবেন"। আর বিভুবাবুর ও মনে পড়ে গেল ঠিক বিয়ের আগের বছর এর কথা,দুই বাড়িতেই সব জানাজানি হয়েগেছে, খালি ডেট ফাইনাল করা বাকি,এমন সময় একদিন ডিনার এ নেমন্তন্ন হবু শ্বশুর বাড়িতে। খাসী মাংসের সাথে ইলিশের ঝাল ও আছে। ইলিশ পছন্দের মাছ হলেও কাঁটা টা ঠিক ম্যানেজ করতে পারেন না বিভু বাবু, তাই ইলিশ ভাজা ই বেশি পছন্দ। পড়ে গেলেন মহা  বেকায়দায়। হবু শালী দের সামনে, বউ এর মাসী দের সামনে চূড়ান্ত কেস খাওয়া। অবশেষে উদ্ধারে সেই অর্ধাঙ্গিনী  । প্রতিজ্ঞা করেছিলেন বিভুবাবু যে পরের জামাই ষষ্ঠী তে দেখিয়ে দেবেন যে তিনি কত এক্সপার্ট কাঁটা ছাড়াতে , দরকার হলে কাঁটা চামচ দিয়েও কাঁটা ছাড়ানো শিখে নেবেন।

সাত বছরের পুরোনো ছেলেমানুষির কথা ভেবে নিজেই একটু হেসে নেন । ইলিশ ততক্ষণে মাছের ব্যাগ এ ঢুকে পড়েছে। তারপর পকেট হালকা আর মন আনন্দে পূর্ণ করে , অভি বাবুর দিকে তাকিয়ে  বিভু বলেন,"চলুন দাদা ,এবার বাড়ি ফেরা যাক"  ....

Saturday, July 8, 2017

ক্যারম

~~"আমি ডান দিকের সিঁড়িটা দিয়ে উঠে যাচ্ছি অনীশ, তুই আমাকে কভার কর,"হিস হিসিয়ে কথাটা বলেই নিঃশব্দে উঠেগেল রোহিত।জার্মান মাউজার এর লক টা আরেকবার দেখেনিল অনীশ।এরকম কভার্ট অপারেশন নতুন নয়,আট বছর হয়েগেলো ফোর্স এ ,তবুও বেসিকস ঠিক  রাখতেই হয়। পাক্কা ইনফরমেশন আছে, কিছু এক্সট্রিমিস্ট এই বিল্ডিং এরই পাঁচ তলায় আছে।আরেক টা ফ্লোর উঠে ডান দিকে ঘুরতেই কপালে জোর একটা আঘাত, তারপর ই সব ব্ল্যাক আউট।

জ্ঞান ফিরতে দেখলো, ওপর থেকে ঝুলিয়ে রাখা আছে তাকে।লোহার রড লাল  করে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে অনীশ এর দিকে, দাতে দাঁত চেপে অনীশ অপেক্ষা করতে থাকলো টর্চারের। মরে যাবে তবু মুখ খুলবে না,এ ট্রেনিং নেওয়া আছে,আজ পরীক্ষার দিন।রোহিত  টা যে কোথায় গেল!!!আবার যখন জ্ঞান ফিরলো,আর্মি হসপিটাল এ শুয়ে আছে অনীশ।খালি কোমরের তলায় সাড় নেই।ডাক্তার বলেগেলেন ,"সরি ফর ইওর লস মাই ব্রেভ সন, ইউ ডিড এ গ্রেট সার্ভিস টু ইওর কান্ট্রি,ইওর ফোর্স"!!! ম্লান হাসি খেলে গেল অনীশ এর মুখে।ওই তো একটা খালি হুইল চেয়ার নিয়ে ঢুকছে রোহিত আর   রিয়া। হৃদপিন্ড টা যেন এক সেকেন্ড এর জন্য থমকে গেল ,তবে কি যা শুনেছিল সবই সত্যি !!! ব্যথার ভান করে চোখ বুজল অনীশ।আর কারুর কোনো কথাই শুনতে ইচ্ছে করছে না।

এক বছর কেটে গেছে।রোহিত এর প্রতিপত্তি, লিডারশিপ এবিলিটি তে সবাই মুগ্ধ।সবচেয়ে বড় কথা , ডিরেক্ট কমব্যাট থেকে ট্রান্সফার হয়ে টেক ডিপার্টমেন্ট এর হেড অনীশ অব্দি তার সাপর্টে, রোহিতের চিফ অফ ডিপার্টমেন্ট হওয়া আটকায় কে? টেক ডিপার্টমেন্ট এর ছোট্ট ঘরটাই অনীশ এর সব।অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াও রয়েছে একটা বিরাট ম্যাচ বোর্ড, ক্যারম এর। ইউনিভার্সিটি চ্যাম্পিয়ন ছিল অনীশ।এখনো ক্যারম এর স্ট্রাইকার তার নিঃসঙ্গতাকে ভরসা দেয়।শুধু রোহিত কে সে টাচ করতে দেয় ওই বোর্ড টা। আজ একটা অপারেশন এর পর ফিরলো রোহিত,শুট এট সাইট এনকাউন্টার অর্ডার ছিল। একটা গুলি ডান হাত ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে।ছুটতে ছুটতে ঢুকে পড়লো, অনীশ এর চেম্বার এ।জামাখুলে ব্যাণ্ডেজ বাঁধতে বসলো।অনীশ চুপ চাপ গুটি সাজাচ্ছিলো বোর্ডে।দেখলো নতুন ট্যাটু করিয়েছেন রোহিত বাবু,ডান কোমরের কাছ থেকে পেট অব্দি সিংহের মুখ।সিক্স প্যাক চেহারায় ভালোই খুলেছে ব্যাপার টা।ম্যাচ শুরু হতেই মুচকি হেসে অনীশ বলল,"একটা পুরোনো সমস্যা সলভ হয়েছে।জেনে গেছি আমাকে সেই টর্চারের পেছনে কে ছিল। মুড ভালো আছে, তোকে আজ সেঞ্চুরি বোর্ড মারবো।বলেই স্ট্রাইক।হিটে ই চার গুটি গেল। লাস্ট গুটি টা ফেলার সময় দেখলো ঠিক অপজিট এঙ্গেলে বোর্ডের ডায়াগোনালি দাঁড়িয়ে রোহিত, মুখ হাঁ করে দেখছে জিনিয়াস অন হুইলস এর খেলা।অনীশ বলল,রোহিত ঐখানেই দাড়া, তোকে চটকা শট দেখাই।বলেই ডান হাতের মধ্যমা আর বুড়ো আঙ্গুল এরমাঝে স্ট্রাইকার বসিয়ে অদ্ভুত ভাবে একটা হিট করলো নিজের বেসে এ।স্ট্রাইকার কোনাকুনি ছিটকে গিয়ে রোহিতের সামনের পকেটে গিয়ে ফেলেদিল শেষগুটি।এক মুহূর্তের জন্য যেন চিনচিনে ব্যাথা পেলো রোহিত, পর মুহূর্তেই সব ঠিক।আস্তে আস্তে খালি বোর্ডের উপরে একটা কার্ড রাখে রোহিত।তার আর রিয়া এর বিয়ে।প্রথম ইনভাইট অনীশ কে।পুরোনো স্মৃতি যেন চলকে ওঠে চোখের সামনে।বেস্ট উইশ জানিয়ে অল্প হাসে অনীশ।পরের দিন সকালেই খবর আসে অফিস এ। নিজের বাথরুমের ভেতর রোহিতের ডেড বডি পাওয়া গেছে। পোস্টমর্টেম এ জানা যায় বিষক্রিয়ায় মৃত্য।তার মোবাইল ট্র্যাক করে দেখাগেল এনকাউন্টার এর পরে  অনেকগুলো বার এ সেই রাতে রোহিত ঢুকেছিলো অফিস ফেরার আগে।নেশা হিসেবে মাঝে মধ্যে ইনজেকশন নিতো রোহিত, বাঁ হাতে ইনজেকশন এর দাগ ও ছিল।গোটা শরীর  জুড়ে ট্যাটু।সেটাই কি কাল হলো??

আরও ছয়মাস কেটে গেল।নতুন চিফ অফ ডিপার্টমেন্ট এর ট্রান্সফার এর জন্য ফেয়ার ওয়েল নিচ্ছে অনীশ।মুম্বাই চলে যাচ্ছে সে।হুইলচেয়ার তার কাজের ক্ষেত্রে উন্নতিতে বাধা হতে পারেনি। সবাই কে ধন্যবাদ জানিয়ে সে বললো যে সে চলে যাওয়ার পর যেন তার বন্ধুর স্মৃতিতে ওই ক্যারম বোর্ডে আর কেউ না খেলে।পাতলা প্লাষ্টিক কভার একটা চাপিয়ে চলে যায় সে।

নতুন বাচ্চা সুমিত  জয়েন করেছে। সে নাকি দারুন ক্যারম খেলে।সবাইতাকে পুরনো গল্প শোনায়। থাকতে না পেরে একদিন   সেই বোর্ডের কভার খুলে সে  আনমনে  হাত বুলোতে থাকে।এত সুন্দর পালিশ করা ম্যাচ বোর্ড।আর কেউ খেলে না এটায়! কি দুর্ভাগ্য! হটাৎ ই একটা পকেটের পাশে হাত দিতেই মনে হয় কেউ যেন  একটা চিমটি কাটলো । সুইচ টা দেখতে পায়নি সুমিত ,যেখানে বলে বলে হিট করতো অনীশ এর স্ট্রাইকার, বিষ মাখানো নিডল টা চোখের পলকে বোর্ড এর সেই পকেটের বাইরের দিক থেকে বেরিয়ে সুমিতের ডান কোমরে ছুঁয়ে আবার ভেতরে ঢুকে যায় ~~~~~



Sunday, June 25, 2017

প্রসাদের থালা

আমি বল্টে, বয়স চোদ্দ, রোগাটে গড়ন, গায়ের রং কালো, আর বয়সের তুলনায় একটু লম্বা আর একটু পাকা, বরেন কাকু বলে। রঘুনাথপুরের স্টেশনের ঠিক পেছনে বুড়ো বট তলার পূর্ব পাশেই বরেন  কাকুর দো তলা মাটির বাড়ি। জন্ম থেকে সেখানেই আছি। বরেন কাকুর তিনকুলে কেউ এখন আর নেই, আমারও  কেউ ছিল কিনা জানি  না। বছর কুড়ি আগেই একটা এক্সিডেন্ট এ বরেন কাকুর বউ,বাচ্চা,বাবা আর মা মারা যান। বরাতজোরে টিকে গেছিলো বরেন কাকু।আর বিয়ে করেনি।বাড়িটাকে একটা অনাথ আশ্রম বানিয়ে দিয়েছে।আমি ই এক নম্বর এই বাড়িতে।আরো আটজন আছে। বরেন কাকু আমাকে স্টেশনের ধারে রাখা একটা  ভাঙা ওয়াগোনের ভেতরে পেয়েছিল গামছা জড়ানো অবস্থায়।চারপাশে অনেক জং ধরা নাট বল্টু পড়ে ছিল।সেই থেকে  আমি বল্টে ।
এক নম্বর তাই একটু বেশি ভালোবাসে।কি যেন বলল,হ্যাঁ, আমাকে দত্তক নিয়েছে, নাম দিয়েছে অজয়, আমার আধার কার্ড ও আছে। ক্লাস এইটে পড়ি আমি।পরশুদিন ক্লাসে ব্যাটারী নিয়ে এসেছিলেন ভৌতবিজ্ঞানের স্যার। বেশ মজার জিনিস শেখালেন।কাল স্কুল ছুটি, কাল তো রথ।এই রথের দিনগুলো বেশ মজা হয়, বরেন কাকু রথ এনে দেয় একটা ছোট্ট, আমরা সবাই মিলে সেটাকে সাজাই। রথ সাজানো কিন্তু চাট্টিখানি কথা নয়।রঙ্গিন কাগজ,সেলোটেপ, আঠা,কাঁচি আরো কত কি লাগে।
আমাদের পাড়ায় প্রতি বছর রথের মেলা হয়, রথ কম্পিটিশান হয়, একবার ও ফার্স্ট হতে পারিনি।এবারে ও চেষ্টা করতে হবে।শোলা কেটে নকশা ভালোই পারি, কিন্তু আলো নিয়েই মুশকিল,মোমবাতি ই ভরসা। কিন্তু এবারে ঠিক করেছি ব্যাটারী  আলো করবো।এভারেডি ব্যাটারী এনেছি বড় গুলো,তিন টে।একটার পর একটা পরপর লাগিয়ে ভালোকরে খবরের কাগজে এগ রোলের মতো পাকিয়ে নিয়েছি।এবার টুনি কিনে হোল্ডারে জুড়ে দিলেই হলো।লাল তার একদিকে আর অন্য দিকে কালো তার , আর পুরোটাকে আটকে রাখার জন্য গার্ডার। ব্যাস ,হয়েগেলো আলো।এইবারে প্রসাদ টাও ভালো করে করতে হবে, চানা, বাতাসা, কলা,শসা তো থাকবেই,ভাবছি নকুলদানাও দেবো।অনেক কষ্টে বরেন কাকুকে রাজি করিয়েছি।আসলে ধান্দা অন্য।আমি দেখেছি যে রথের মেলায় লোকে চারাগাছ ছাড়া আর কিছু কেনে না,ভালো রথের দিকে তাকিয়ে প্রশংসা করে বটে কিন্তু প্রণামী দেয় না, কিন্তু প্রসাদ পেলে কিছু না কিছু দেবেই। সেই টাকা জমিয়ে পরের দিন ফিস্ট করব।সেটাই মজা। সব্বাইকে আমার প্ল্যান বলে দিয়েছি।সবাই রাজি। বরেন কাকু কে বলিনি,খুব মারবে তাহলে।
টাকা ভালোই উঠছে, জগন্নাথ,বলরাম,সুভদ্রার কৃপায়।এমন সময় হঠাৎ ভীষণ ঝড় উঠলো,তারসাথে বৃষ্টি। সব যেন লণ্ডভণ্ড করেদেবে।সবাই পালাতে ব্যস্ত। একটাই মাত্র লোক তখন আমাদের রথের সামনে দাঁড়িয়ে,গম্ভীর মুখে আমাদের নাম কি,কোথায় থাকি জিগ্যেস করছে আর টকা টক প্রসাদ খেয়ে যাচ্ছে,প্রণামী দেওয়ার নাম ই নেই।আমরা তখন পালাতে পারলে বাঁচি।দুহাতে রথ টা জড়িয়ে দৌড় দিলাম আমি ।বাকিদের কেউ সামলাচ্ছে প্রণামী এর বাটি, কেউ প্রসাদের থালা। প্রচন্ড বৃষ্টি আর কড়কড় করে বাজ পড়ছে। সবাই আলাদা হয়েগেছি। রাত অনেক,ভয় ও করছে।অনেক দেরিতে যখন বাড়ি পৌঁছলাম,দেখি বরেন কাকু হ্যারিকেন হাতে বাইরের ঘরে পায়চারি করছে।আমাকে দেখে ,কান টা খুব জোরে পাকিয়ে দিয়ে বললো,"পালের গোদা হয়েছ? এক চড়ে পিঠ ফাটিয়ে দেব তোর, এতগুলো বাচ্চা কে নিয়েগেছিস,কোনো আক্কেল আছে?" কোনোমতে চোখের জল সামলে নিজের বিছানায় শুয়ে পড়লাম।প্রসাদের থালা, প্রণামী এর বাটি,সব হারিয়ে গেছে,রথ টা  এক কোণে রেখে প্রনাম করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকালে রোদ উঠেছে,আমাদের মন ও আকাশের মতো ঝকঝকে হয়ে উঠেছে।পান্তা,আলুমাখা আর কাঁচালঙ্কা খেতে খেতে বললাম,"জানো বরেন কাকু,আমাদের ফিস্ট ও গেলো, প্রণামী এর বাটিও গেলো, প্রসাদের থালা ও হারালো।তার ওপর একটা লোক কালকে প্রচুর কথা জিগ্যেস করলো,আমার নাম,তোমার নাম,ঠিকানা ,আরো কত কি ,প্রসাদ ও খেলো কিন্তু কি ছোটলোক ভাবো, প্রণামী দিলো না!!!"
বরেন কাকু আস্তে করে উঠে গিয়ে একটা সাদা খাম এনে সবার সামনে ফেলে বললো,
"তোরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই সে এসে প্রণামী দিয়েগেছেরে, এক হাজার এক টাকা,তোদের প্রথম পুরস্কার।"




Friday, June 23, 2017

অবচেতন কে চিঠি

অনেক দিন ধরেই ভাবছিলাম,তোমাকে একটা চিঠি লিখি, ইমেইল নয়, টেক্সট নয়,হোয়াটস আপ নয়, বিশুদ্ধ নিখাদ চিঠি।গোদা বাংলায়  ।ছোট্ট করে, অল্প কথায় । কিন্তু কি লিখবো ভাবছিলাম।কতকিছুই যে মাথায় আসে।সবচেয়ে বেশি আসে কিছু না লেখার অজুহাত।মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছে করে, তুমি কি আমার মতোই ক্লান্ত, এবং মাঝে মাঝে কিঞ্চিৎ বিরক্ত! কে জানে! তোমাকে জানার বা বোঝার বিশেষ চেষ্টা কোনোদিন করিনি।কি দরকার ,জীবনে করার মতো আরো কত কি আছে, কেন তোমাকে জেনে সময় নষ্ট করবো? যে ফর্মুলা ওয়ান এ আমি চলেছি,তাতে প্রতিটা পিট স্টপে শুধু এটাই ভাবতে  শেখানো  হয় যে আর কটা ল্যাপ বাকি। বরং মাঝে মাঝে চিন্তা করে দেখেছি যে তোমাকে জানার চেষ্টা করলে বিপদ বেশি।যেমন, তুমি আয়না হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে  বলবে যে আমি কেন জীবনে একটার সঙ্গে আরেকটা ভূমিকায় মুহূর্তের মধ্যে নিজেকে পাল্টে নিচ্ছিনা ??? আমি বলবো,ধুত্তোর ,নিকুচি করেছে রোল প্লে এর নাটকের , আমি অফিসেও মাঝে মাঝে বাড়ির মতো,বাড়িতেও মাঝে মাঝে অফিসের মতো থাকবো, ভাববো ,হয়তো বা রিএক্ট ও করবো। ব্যালান্স করা জিমন্যাস্ট এর কাজ, আমার নয়। তুমি চুপচাপ শুনবে আর নিঃশব্দে হাসবে।আমি নিজেরই বকবকানিতে নিজে  ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ব, তুমি তো সদা জাগ্রত,ঘুমের বালাই নেই। তুমি অপেক্ষা করবে, আবার আমার জেগে ওঠার,দিন শুরু করার, কিছু ভুল শুরু করার।তুমি এক অদ্ভুত শিক্ষক, যে জ্ঞান দেয় না, সময় কে দিয়ে সময় মতো একটা থাপ্পড় কষিয়ে বুঝিয়ে দাও যে এখনো সময় আছে,শুধরে যা। সব সময় যে তোমার কথা শুনি এমন দাবি কোনোদিন করি না ,তবে চেষ্টা করি।আজ আর লিখবো না, অন্য আরেকদিন ।তোমার কথা আমার ঠিক মনে থাকবে।ও হ্যাঁ, কৈফিয়ত দেওয়ার কিছুই নেই ,তবুও বলি হঠাৎ কেন চিঠি লিখতে বসলাম,
 কারণ বহুদিন পর আবার মনে পড়ে গেল সেই অসাধারণ কথা টা," Talk to yourself at least once a day,otherwise you will miss talking to an excellent person".....ভালো থেকো,নিজের মতো।

Sunday, June 11, 2017

বমমার গিফট

ট্রান্সফারের চাকরির সবচেয়ে বিরক্তিকর জিনিস হল, দুই তিন বছর অন্তর ঘরবাড়ি চেঞ্জ করা।যতই বাজে লাগুক উপায় নেই।ব্যাজার মুখে টুটুল ,তার গল্পের বইয়ের তাক থেকে একটা একটা করে বই প্যাক বক্সে ভরা শুরু করল।বউ সামলাচ্ছে বাচ্চা কে।এরপর টুটুল ধরলে তার বউ বাকিটা গুছোবে। মুভার্স এন্ড পাকার্স রা বলেদিয়েছে যে পচ্ছন্দের জিনিস গুলো আলাদা করে রাখতে।কাল ওরা আসবে। তৃতীয় তাকের বইগুলো গুছোতে  গিয়ে কোনের দিকে একটা ছোট লাল মলাটের বইয়ের দিকে নজর গেল টুটুলের। হাতে তুলে মলাট উল্টোতেই সময় টা যেন এক ঝটকায় একুশ বছর পিছিয়ে গেল।

উনিশশো ছিয়ানব্বই সাল।জানুয়ারি মাস।ঠান্ডা ভালোই।পাড়া গাঁয়ের দিকে ঠান্ডা ভালোই পড়ে।
সকাল থেকেই বাড়িতে হইহই চলছে।আজ টুটুলের পৈতে। থার্ড জেনারেশনের একমাত্র নাতি সে। মামীমারা দূরের পুকুর থেকে কলসী তে করে জল এনেছে।এতে বেশ  কয়েকবার স্নান হবে টুটুলের ।নিচে বাড়ির সামনে একটা ছোট বেদী তৈরি।পুরুত ঠাকুর তার দলবল নিয়ে কাজ শুরু কৱেদিয়েছে।
ক্লাস ফাইভের টুটুল খালি বুঝতে পারছেনা যে এতবার স্নান করতে হবে কেন? তাও শীতকালে !!
ইয়ারকীর ও একটা সীমা থাকে।তার ওপরে ধুতি পরা। আবার নেড়া ও হতে হবে।ইস, বন্ধুরা কি আওয়াজ দেবে!!! এই চিন্তাতেই বিভোর সে।কিন্তু ভীষণ রাগী বাবা কে সে বলতেও পারছে না যে সে নেড়া হতে চায় না।কখনোই চায় না।
এইসব ভাবতে ভাবতেই গায়ে হলুদ হলো, দু তিন দফা স্নান ও হলো।কিন্তু এখনো বমমা আসছে না কেন? টুটুল সেই ভাগ্যবান দের দলে পড়ে যারা নিজেদের ঠাকুমার মা কেও দেখেছে। ঠাকুমা হলো ঠাম্মা আর ঠাকুমার মা হলো বড়মা, সহজে বমমা। আশি বছরের বমমা এখনো সোজা হয়ে হাটে, দারুন হাতের লেখা,একটাও দাঁত নেই,আর হামানদিস্তায় পান থেঁতো করে খায়। টুটুল কেও মাঝে মাঝে দেয়। কাল রাতেই এসেগেছেন তিনি ,সবাইকে বলেদিয়েছেন যে , ওই জিনিসটা টুটুলকে যেন আর কেউ গিফট না দেয়। কিন্তু ওই জিনিসটা কি টুটুল এখনো জানতে পারেনি। কেউ কেউ সাইকেল দেবে বলেছে। একগাদা লোক সকাল থেকে গল্পের বই, পেন , কিলো কিলো রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র,সুকুমার রায় দিয়েই যাচ্ছে।
এবার ডাক পড়লো নাপিতের কাছথেকে।টুটুলের চোখে প্রায় জল এসেইগেছে। বাবার দিকে একবার তাকালো।কোনো লাভ নেই ।পালানোর উপায় নেই।সদ্য কেনা ক্ষুর সকালের রোদে ঝকমক করে উঠলো আর একটু একটু করে টুটুলের মাথার চুল আর চোখের জল মাটিতে পড়তে থাকলো। গাড়ি প্রায় আদ্ধেক রাস্তা এসেগেছে, হটাৎ ছোটকাকুর গলার আওয়াজ, "একি, এটা কি হচ্ছে!! , বাবু একবার এদিকে তাকা তো ?" অবাক হয়ে টুটুল তাকাতেই খচাৎ, আদ্ধেক নেড়া মাথার অসহায় টুটুলের ছবি তুলে দাঁত বের করে হাসছে ছোটকাকু। দুনিয়াতে একটাও ভালো লোক আর নেই, স্থির সিদ্ধান্ত নিলো টুটুল। এরপর আরো অনেক নাটকের পর ভিক্ষা পর্ব শুরু হলো।খড়ম পরে থালা হাতে ভবতি ভিক্ষাং দেহি শুরু হলো। হাতের আংটি ,নতুন জামা প্যান্টের পিস এইসব শেষে ,টুটুল দেখলো বমমা আসছে এগিয়ে, টুটুলের বুকটা ধুকপুক করে উঠলো, না জানি কি গিফট দেবে বমমা! ফোকলা মুখে একগাল হেসে একটা ছোট্ট বইয়ের প্যাকেট দিয়ে বললো,"মালকড়ি ভেতরে আছে, রাতে দেখিস যখন বাকি বইগুলো দেখবি"।
রাত্রে সব চুকেবুকে যাওয়ার পর নিজের ঘরে একা একা শুয়ে টুটুল একএক করে সব বইগুলো দেখছে।মাঝে মাঝে অন্যমনস্ক হাত বুলিয়ে নিচ্ছে তার নেড়া মাথা। একটা সাদা রঙের নরম টুপি কে যেন দিয়েছে। সেটাই পরে আছে।কিন্তু বালিশে মাথা রাখলেই মনেহয় যেন ফেভিকল দিয়ে সেটে দিয়েছে কেউ।এই সব দুশ্চিন্তা সরিয়ে বমমার দেওয়া প্যাকেট টা খুললো সে, বেরোলো ছোট একটা লাল বই। মলাটে লেখা ,"শ্রীমদভাগবতগীতা" । মলাট ওল্টাতে ই পাওয়া গেল পাঁচশো একটাকা আর বমমা এর হাতে লেখা কয়েকটি লাইন,
"সুস্থ দেহ,শুদ্ধ মতি, ভোগসুখে নাহি রতি,
হও কর্মে ব্রতী,
মানুষ দেবতা হও, শ্রেয়রে জানিতে চাও,
হও মহামতি।"
--এর একটা শব্দও হয়েওঠা হয়নি টুটুলের। অনেক গুলো বছর চলে গেল বমমার পরে, স্মৃতিটুকু আজও অমলিন।